সরকারিভাবে ঘোষণা থাকা সত্ত্বেও বানারীপাড়া উপজেলার নদীপাড়া খেয়াঘাটে চলছে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের মহোৎসব। যাত্রীদের অভিযোগ—দিন দিন ভাড়া নৈরাজ্য বেড়েই চলেছে, অথচ প্রশাসনের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ এখনো দৃশ্যমান নয়।
সম্প্রতি বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এস সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু ঘোষণা দেন যে, খেয়া পারাপারে জনপ্রতি ভাড়া হবে ৬ টাকা। একইসঙ্গে অন্যান্য যানবাহনের ভাড়াও নিয়ন্ত্রণে আনার নির্দেশ দেন তিনি। উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ মৃধা ইজারাদারদের সতর্ক করে বলেন—সরকারি টোল ছাড়া বাড়তি ভাড়া নেওয়া যাবে না, নির্দেশ অমান্য করলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
কিন্তু বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। যাত্রীরা জানাচ্ছেন, আজও তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৮ টাকা আদায় করা হচ্ছে। বাইসাইকেলের জন্য ১৫-২০ টাকা, মোটরসাইকেলের জন্য ৪০-৫০ টাকা, মালবাহী ভ্যানের জন্য ১৫০-২০০ টাকা এবং ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে ৩০-৪০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করলে যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ এ খেয়া দিয়ে পারাপার হন। জনপ্রতি মাত্র ১ টাকা অতিরিক্ত নিলেই দিনে ১৫ হাজার টাকা উঠে আসে। মাসে প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ৪ মাসে প্রায় ১৮ লাখ টাকা বাড়তি আদায় হয়।
শুধু যাত্রী নয়, মোটরসাইকেল থেকেও আদায় হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। প্রতিদিন গড়ে ৩০০ মোটরসাইকেল পার হয়। জনপ্রতি ২০ টাকা অতিরিক্ত নিলে দিনে প্রায় ৬ হাজার টাকা, মাসে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা এবং ৪ মাসে প্রায় ৭ লাখ ২০ হাজার টাকা অতিরিক্ত উঠছে।
হিসাব অনুযায়ী, মাত্র ৪ মাসে অতিরিক্ত আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ লাখ ২০ হাজার টাকা।
বানারীপাড়ার পশ্চিম পাড়ের অন্তত পাঁচটি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ উপজেলা সদরসহ জেলা শহরে যাতায়াতের জন্য নির্ভরশীল এই খেয়া পারাপারের ওপর। প্রতিদিনের কাজ, পড়াশোনা, চিকিৎসা, কেনাকাটা—সব কিছুর জন্য এই খেয়া অপরিহার্য।
নিয়মিত যাতায়াতকারীরা জানান, ঘোষণার পর তারা সাময়িক স্বস্তি পেয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার শুরু হয়েছে ভাড়া নৈরাজ্য। এতে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে, আর শ্রমজীবী ও স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এই বাড়তি ভাড়া এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, খেয়া পারাপারে মুক্তিযোদ্ধা আ. মান্নান বেপারীর মৃত্যুকেও কেন্দ্র করে এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম-দুর্নীতি ও অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে, আর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুর ঘটনাটি সেই ক্ষোভকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, বারবার অভিযোগ জানানো হলেও প্রশাসন কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। বরং ভাড়া নৈরাজ্যকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তারা প্রশ্ন তুলেছেন—সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে অতিরিক্ত টাকা আদায় চলতে থাকলেও কেন প্রশাসন চুপ করে আছে?
ভুক্তভোগী যাত্রীরা দ্রুত প্রশাসনের নজরদারি এবং কঠোর আইনগত পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেন, “শুধু ঘোষণায় কাজ হবে না, বাস্তবে ব্যবস্থা নিতে হবে। না হলে এই খেয়া পারাপারকে ঘিরে দুর্নীতি ও ভাড়া নৈরাজ্য চলতেই থাকবে।”
একদিকে সরকার যাত্রীসেবার উন্নয়নের কথা বলছে, অন্যদিকে বানারীপাড়ার এই খেয়া ঘাটে চলছে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা। তার ওপর মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুকে ঘিরে উত্তেজনা নতুন করে আশঙ্কার জন্ম দিয়েছে। তাই প্রশ্ন উঠছে—৪ মাসে ২৫ লাখ টাকার বাড়তি ভাড়া আদায়ের পরও প্রশাসন কেন নীরব?